হাজ্জের দিনগুলো

নাম, ইতিহাস ও তাৎপর্য —- হাবীব নূহ

আজ রাত থেকে হাজীগণ মিনায় অবস্থান নিতে শুরু করবেন। শুরু হবে হজের সেই পবিত্র দিনগুলো — যে দিনগুলোর প্রতিটি নামের পেছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের গভীর স্মৃতি, ত্যাগের অমর কাহিনী এবং ইবাদতের অপার্থিব সৌন্দর্য।

১. অষ্টম জিলহজ — يوم التروية (ইয়াওমুত তারবিয়া):

এই দিনটির নামের মধ্যে দুটি অর্থ একসাথে মিলে আছে।

প্রথম অর্থ — পানি বহন করা। একসময় মক্কাবাসীরা এই দিন হাজের উদ্দেশ্যে মিনার পথে রওনা হতেন এবং পথের জন্য পর্যাপ্ত পানি সংগ্রহ করে নিতেন। মরুর বুকে পানিই ছিল জীবন, তাই এই প্রস্তুতি ছিল অপরিহার্য।

দ্বিতীয় অর্থ — চিন্তা করা, গভীরভাবে ভাবা। বর্ণিত আছে যে, এই দিনে ইবরাহিম (আ.) প্রথমবার স্বপ্নে আল্লাহর আদেশ পান — তাঁর প্রিয় পুত্রকে কুরবানী করতে হবে। সেই স্বপ্নের পর তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন —
এ কি রবের পক্ষ থেকে, নাকি অন্য কোনো দিক থেকে আসা প্ররোচনা।

সেই চিন্তার স্মৃতি বহন করে আজও এই দিনটি “তারবিয়া” নামে পরিচিত।

২. নবম জিলহজ — يوم عرفة (ইয়াওমু আরাফা):

এটি হাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন — বরং বলা যায়, হাজের প্রাণ।

এই দিন লক্ষ লক্ষ হাজী আরাফার ময়দানে একত্রিত হন। সাদা ইহরামে ঢাকা মানুষের সেই মহাসমুদ্র — যেখানে নেই কোনো রাজা-প্রজার ভেদ, নেই ধনী-গরিবের পার্থক্য — কেবল এক আল্লাহর সামনে সকলের অবনত মস্তক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন — “আলহাজ্জু আরাফাহ” — অর্থাৎ হজ মানেই আরাফা। (তিরমিযী: ৮৮৯, ইবনে মাজাহ: ৩০১৫)

এই দিনের রোজার ফজিলত অতুলনীয়। নাবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন — আরাফার দিনের রোযা দুই বছরের গুনাহ মোচন করে — একটি বিগত বছরের এবং একটি আগত বছরের। (মুসলিম: ১১৬২)

৩. দশম জিলহজ — يوم النحر (ইয়াওমুন নাহর):

“নাহর” অর্থ কুরবানী। এটি ঈদুল আদ্বহার দিন — কুরবানীর দিন।

এই দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন — “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মহান দিন হলো কুরবানীর দিন, তারপর তাশরিকের দিনগুলো।” (আবু দাউদ: ১৭৬৫)

এদিন ইবরাহিম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত হয় — যে ত্যাগ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার উত্তর।

৪. একাদশ জিলহজ — يوم القرّ (ইয়াওমুল কার্র):

“কার্র” অর্থ স্থির থাকা, বিশ্রাম নেওয়া।

হাজের ব্যস্ততম কাজগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর এই দিন হাজীরা মিনায় স্থিরভাবে অবস্থান করেন। ঝড়ের পরের প্রশান্তির মতো — এই দিনটি হাজীদের জন্য আত্মার বিশ্রামের দিন। ইবাদাত, দুআ ও আল্লাহর স্মরণে কাটে এই পবিত্র অবকাশ।

৫. দ্বাদশ জিলহজ — يوم النفر الأول (ইয়াওমুন নাফরিল আওওয়াল):

“নাফর” অর্থ বের হওয়া। এটি প্রথম বের হওয়ার দিন।

যে হাজীরা তাড়াতাড়ি ফিরতে চান, তারা এই দিন জামারাতে পাথর নিক্ষেপ শেষে মিনা থেকে বিদায় নেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন — “যে দুদিনে তাড়াতাড়ি চলে যায়, তার কোনো গুনাহ নেই।” (সূরা বাকারা: ২০৩)

৬. ত্রয়োদশ জিলহজ — يوم النفر الثاني (ইয়াওমুন নাফরিস সানি):

এটি দ্বিতীয় বের হওয়ার দিন এবং মিনায় অবস্থানের শেষ দিন।

যে হাজীরা আরও একদিন মিনায় থেকে অতিরিক্ত ফজিলত অর্জন করতে চান, তারা এই দিন পাথর নিক্ষেপ শেষে বিদায় নেন। এর সাথে সাথে হজের মূল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

৭. আইয়ামে তাশরিক — أيام التشريق (১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ):

এই তিনটি দিনকে একত্রে “আইয়ামে তাশরিক” বলা হয়। “তাশরিক” শব্দের অর্থ — রোদে মাংস শুকানো। প্রাচীনকালে হাজীরা কুরবানীর মাংস এই দিনগুলোতে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতেন, যাতে দীর্ঘ পথের সফরে সাথে নিয়ে যেতে পারেন।

এই দিনগুলো আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর জিকিরের দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন — “তাশরিকের দিনগুলো হলো খাওয়া, পান করা এবং আল্লাহর জিকিরের দিন।” (মুসলিম: ১১৪১)

About the Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like these