এর সম্মেলন ঘিরে—
‘ছোট্র স্মৃতির বিশাল ঝলকানি’
—হাবীব নূহ
১.
হাবীব! আমি ইয়াসিন কেনিয়ার,চিনতে পেরেছো আমাকে?
কল রিসিভের পর সালাম এবং সালামের জবাব শেষে ইয়াসিনের উল্লিখিত প্রশ্ন ছিল আমার কাছে।
আমি ফিরতি প্রশ্ন করলাম, “আপনি কেনিয়ার অথচ ফোন তো ইংল্যান্ড থেকে করা হয়েছে, তাও নর্থ-ইংল্যান্ডের কোথাও থেকে, তাই না?
তিনি বললেন,ঠিক ধরেছো হাবীব, হ্যাঁ আমি এখন ইংল্যান্ডেই আছি।এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে এসেছি।ভাতিজার বাড়িতে আছি।চারদিন পর Nairobi-তে আবার ফিরে যাচ্ছি।
আমি আবার বললাম, আপনি যদি আমাদের ইয়াসিন ভাই হয়ে থাকেন তাহলে তো বয়স পঞ্চাশ থেকেও পাঁচ/ছয়/সাত বেশি হওয়ার কথা কিন্তু আপনার স্বর যে এখনো এত মিহি?
তিনি হাসলেন।একটু জোরেই হাসলেন।
লোকটি এমনই, তাঁর ঠোঁট সব সময়ই যেন হাসে।এ হাসি লুকানো যেন তাঁর জন্য দুষ্কর।
তাঁর চেহারায়ও থাকে হাসির আভা।
তারপর তিনি বললেন, দূর পাগল! আচ্ছা, এসব রাখো,আগে বলো কোনদিন তোমাকে দেখতে আসবো।অন্য কাজ বাদ দিয়ে হলেও এবার তুমি ও শামীমকে দেখে যাব।
ইয়াসীন ভাইকে চিনতে আমার অসুবিধা হয়নি।তিনি আমাদের করাচির বন্ধু।বানুরী (বিন্নুরী) টাউনের ছাত্র।
বন্ধুত্বের খাতিরে তিনি একবার সিলেটও বেড়িয়ে গেছেন।
কিন্তু দুই যুগেরও বেশি সময় হয়ে গেছে, তাঁর সাথে দেখা নেই, কথা নেই।
তবে তাঁকে আমি মনে মনে খুঁজছিলাম।তিনিও আমাদেরকে খুঁজছিলেন।কারণ, পড়া শেষে আমরা ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই।আর তখনকার দিনে মোবাইলের সুবিধা ছিল না বিধায় পরবর্তীতে অন্য ভাবে যোগাযোগ আর বেশি দিন টিকেনি বা রক্ষা করা হয়ে উঠেনি।
অবশেষ তিনি আমাদের ফোন নাম্বার কোথাও থেকে সেদিন জোগাড় করতে সক্ষম হন।
তাই, সেদিন অর্থাৎ ২০ নভেম্বর ২০২২-এ তাঁর ফোন ছিল আমার জন্য যথার্থ চমক।আমার বাইশ সালের সেরা ফোন।
এর দুই দিন পর তিনি আমার বাড়ি (ইংল্যান্ড) ঘুরে গেলেন।
দীর্ঘ সময় পর তাঁকে দেখে সেই আগের মতই মনে হল শুধু তাঁর দাড়িতে কিছুটা পাকন ধরেছে।
অবশ্য আমাদের যে কয়জন করাচির বন্ধু ছাত্র কালীন বিবাহিত ছিলেন তিনি তাঁদের একজন।
২.
সেদিন লম্বা কথোপকথনের এক সময় প্রসঙ্গ হয় প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান রাহিমাহুল্লাহ এবং জামেয়ার জলসা।
মজার যে ঘটনাটি আমার কাছে বিস্মৃত ছিল তিনি তা আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং তা ছিল জামেয়ার জলসাকে ঘিরে এক কাহিনী।
অবশ্য এ ঘটনাটি নাকি ইয়াসীনের কাছে চিরস্মরণীয়।
৩.
একসময় বিদেশী অতিথি ছিল জামিয়ার জলসার অন্যতম আকর্ষণ।আর বিদেশী বক্তাকে দেখতে-শুনতে জামিয়ায় লোকসমাগম হত প্রচুর।জামিয়ার জলসা ছিল এ ক্ষেত্রে অনন্য।আশপাশ দেশ ও বিশ্বের বিজ্ঞ আলিমদের সাথে দেশের সচেতন মানুষদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয়া ছিল প্রিন্সিপাল রাহিমাহুল্লাহ’র অন্যতম প্রয়াস।
সম্ভবত ১৯৯২ সাল ছিল।জামেয়ার জলসায় বিদেশী কিছু বড় মেহমান আসার কথা থাকলেও কোন কারণে কিন্তু তাঁদের আসা হয়নি।
এদিকে, তখন আমাদের সিলেটের বাসায় দুজন বিদেশী অতিথি বন্ধু ছিলেন।
অগত্যা, উদ্বিগ্ন প্রিন্সিপাল রাহিমাহুল্লাহ,সন্ধ্যার পর আমার বাড়িতে গাড়ি সহ লোক পাঠালেন এবং সাথে সাথে ল্যান্ড ফোনে আমাকে বললেন, “যে কোন ভাবে যেন মেহমানদেরে নিয়ে জলসায় হাজির হই।”
কিন্তু সমস্যা শুরু হল তখনই যখন মেহমানরা জিদ ধরলেন মাহফিলে যাবেন না,।হেতু হলো তাঁরা বক্তা নন।বক্তৃতায় তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।বিরাট মাহফিলে কথা বলার সাহস তাঁদের নেই
অবশ্য পরিশেষে কিছু একটা ভেবে সম্মত হলেন ইয়াসিন ভাই।তিনি হাফিয ও আলিম।
<এখন কেনিয়ার নাইরোবিতে তাঁর মাদরাসা আছে>
অতঃপর তিনি কাঁপতে কাঁপতে স্টেজে দাঁড়িয়ে তাবলিগী ধারার কিছু বয়ান করলেন।আমি জোড়াতালি দিয়ে এগুলির অনুবাদ করেছিলাম
অতঃপর প্রিন্সিপাল রাহিমাহুল্লাহ এগুলিকে আবার আরো প্রাণবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
পরন্তু, এই অভিনব অতিথি পেয়ে শ্রোতা-দর্শকগণও আরো প্রফুল্ল হয়েছিলেন।
৪.
প্রিন্সিপাল রাহিমাহুল্লাহ’র সেদিনের আতিথ্যে এবং স্নেহে ইয়াসিন ভাই নেহাত মুগ্ধ হয়েছিলেন যা আজও যেন তাঁর কাছে সজীব।
তবে সেদিন ইংল্যান্ডে আমার ঘরে এই কিংবদন্তি প্রিন্সিপাল রাহিমাহুল্লাহ’র মহা-প্রয়াণের দুঃসংবাদ শুনে কেনিয়ার ইয়াসিন খুবই ব্যথিত হয়েছেন।